স্বন্দীপ

স্বন্দীপ বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্ব উপকূলে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত মেঘনা নদীর মোহনায় প্রায় ৭৬০ বর্গ কি.মি. জুড়ে থাকা চট্টগ্রাম জেলার অত্যন্ত প্রাচীন একটি দ্বীপ। পশ্চিমে জেগে উঠেছে সুবিশাল চর, পূর্বাঞ্চলে ভাঙ্গন। ভাঙ্গা গড়ার খেলা চলছে দিনরাত। তবুও সে চিরযৌবনা।

স্বন্দীপের খোঁজ মিলল চট্টগ্রামের এক বন্ধুর কাছে।এদিকে অনেক দিন ধরেই ক্যাম্প করব করব করেও করা হচ্ছেনা। ঘুরাঘুরির সব অঙ্ক মিলিয়ে নিয়ে শীতের শেষে ৪ বন্ধু মিলে কেটে ফেললাম চট্টগ্রামের বাসের টিকেট। রওয়ানা হলাম স্বন্দীপের উদ্দেশ্যে। ভোরের আলো ফুটতেই আমরা সীতাকুন্ড পার হই। ড্রাইভারকে বলে নেমে যাই কুমিরা। কুমিরা থেকে রিকশা নিয়ে সোজা কুমিরা ঘাট। কুমিরা ঘাট থেকে স্বন্দীপ যাওয়ার পন্থা দুটি। যেতে পারেন লঞ্চে করে, অথবা স্পীড বোটে। এখানে খরচ একটু কমিয়ে আনতে চাইলে যেতে হবে লঞ্চে।তবে এক্ষেত্রে একটি অসুবিধা হল, লঞ্চ শুধুমাত্র দুটি নির্দিষ্ট সময়েই ছেড়ে যায় এবং ফেরত আসে। স্পীড বোট একটু ব্যায়বহুল হলেও সময় বেঁচে যায় এতে।

ভোরে কুমিরা ঘাট পৌঁছে দেখি দোকান পাট সব তখনও বন্ধ কিন্তু বেশ কয়েকজন মানুষ লাইন করে দাঁড়িয়েছে। কথা বলে জানতে পারলাম স্পিডবোটের টিকেটের জন্য এই লাইন।প্রতিদিনই বেশ কিছু মানুষ জীবিকার তাগিদে চলে যায় স্বন্দীপে। সকাল ৭টা থেকে টিকেট দেয়া শুরু হল। সাগর পথে স্পিড বোট, একধরনের অ্যাডভেঞ্চারই বটে! যতবার ঢেউগুলো বোটের গায়ে আছড়ে পড়ছিলো, একটু একটু ভয় কাজ করছিলো। জানিনা কি করে এই ভয় বুকে নিয়ে মানুষ প্রতিদিন পাড়ি জমায় স্বন্দীপের উদ্দেশ্যে!আধা ঘন্টার মধ্যেই স্পিড বোট আমাদের নামিয়ে দিল স্বন্দীপ ঘাটে। এই ঘাটটি অনেকের কাছে গুপ্তছড়া ঘাট নামেও পরিচিত। সাগর পেরিয়ে জনপদে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে সুবিশাল ম্যানগ্রোভ বন। ক্যাম্পিঙের জন্য সবচেয়ে সুন্দর জায়গা হল স্বন্দীপের পশ্চিম দিকে নদী ঘেঁষে। জায়গার নাম রহমতপুর। স্বন্দীপে যেয়ে হোটেলে থাকতে চাইলে চলে যেতে হবে টাউন কমপ্লেক্সে। সেখানে থাকা খাওয়ার ভাল ব্যবস্থা রয়েছে। খাওয়ার কথা থেকে মনে পড়ে গেল, সকালের নাস্তা করা হয়নি এখনও। তাই এবার আমরা চলে গেলাম টাউন কমপ্লেক্সে।

যাওয়ার রাস্তায় দুপাশে দেখতে পাবেন কারুকার্জ খচিত বাড়িঘর কিংবা সুদৃশ্য শান বাঁধানো পুকুর ঘাট। কোথাও বা দেখতে পাবেন পানের বরজ। কমপ্লেক্সে নেমে একটা খাবারের হোটেলে নাস্তা সেরেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম স্বন্দীপ ঘুরতে। শুরুতেই গেলাম উত্তরাংশে সবুজচর এলাকায়। স্বন্দীপের মানুষদের বেশ অতিথিপরায়ণই মনে হল। একজন লোকাল মানুষ আমাদের ঘুরে দেখাচ্ছিলেন আর একেক চরের একেক গল্প শুনাচ্ছিলেন। তারপর চলে গেলাম আজিমপুর গ্রামের দিকে। সেখানেও দেখতে পেলাম নতুন জেগে ওঠা চর। স্বন্দীপে যদি ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত এবং তৃষ্ণার্ত হয়ে যান তবে চিন্তা নেই। প্রায় সব রাস্তার পাশেই সবসময় পাবেন ডাব এবং নারকেল। স্বন্দীপের ডাব বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের ডাবের চেয়ে স্বাদে বেশ ভিন্ন। আর ডাবের মিষ্টি পানির প্রতি চুমুকেই আপনার শরীরের সকল ক্লান্তি হারিয়ে যাবে নিমিষেই। রাস্তার ধার থেকে ডাব খেয়ে আরও কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে আমরা চলে যাই কমপ্লেক্স হারামিয়াতে, দুপুরের খাবার সারতে। গরম ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাত, শুটকি আর তাজা মাছ ভাঁজা! জম্পেশ খাওয়া হল। এবার দুপুরের খাবারের পর এবার একটু মিষ্টি না খেলে ঠিক জমেনা! তাই হোটেলেই কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে চলে গেলাম শিবের হাট। ঢুকে পড়লাম ৮০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকান ‘বিনাশাহ’তে। এবার স্বন্দীপের বিখ্যাত রসগোল্লা চেখে দেখার পালা। যেমন স্বাদ ঠিক ততোটাই টাটকা! আমার মত মিষ্টি পাগল মানুষের জন্যে একের পর এক ৪-৫ টা মুখে পুরে দেয়া কোন ব্যাপারই না।

বিকেল গড়াতেই আমাদের মধ্যে ক্যাম্পিং এর উত্তেজনা জোরালো হতে শুরু করল। আমরা চলে গেলাম রহমতপুর শিবঘাটা সাগর পাড়ে। স্তব্ধ হয়ে বসে সমুদ্রের গর্জন শোনার সে যেন এক অদ্ভূত অনুভূতি। বিকেলের ক্লান্ত দেহে শান্ত সমুদ্রের দিকে নির্বিঘ্নে তাকিয়ে রইলাম আমরা। সৈকতে আছড়ে পড়া সূর্যের সোনালী আভা কেমন একটা অদ্ভূত মায়া সৃষ্টি করে পুরো জায়গাটা জুড়ে। দিনের আলো থাকতে থাকতেই আমরা একটি উপযুক্ত জায়গা দেখে আমাদের তাবু প্রস্তুত করে ফেললাম। স্বন্দীপে দেখার বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে উপভোগ্য হল এখানের সুর্যাস্ত। চুপ চাপ গোমট নীরবতায় সূর্য যেন ধীরে আড়াল হয়ে গেল নিজ গন্তব্যে। আমরাও সেদিনের মত ঐ তাবুতেই রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা শুরু করলাম।যারা ক্যাম্প করে থাকেন তারা জানেন ক্যাম্পিং এর জন্য আসলে কি ধরনের সরঞ্জামাদি লাগে, তাই সেদিকে আর না যাই। ক্যাম্পিং এর জন্য প্রয়োজনীয় সব জিনিসই আমরা নিয়ে গিয়েছিলাম। পাশের বাজারেই রাতের খাবার খেয়ে নিয়ে আমরা ক্যাম্প ফায়ার করলাম। আমাদের গায়ক বন্ধু গিটারে গান ধরলো। সুরের মূর্ছনায় কেটে গেলো আশেপাশের নিস্তব্ধতা। পুরো সৈকত জুড়ে শুধু ৪টা মানুষ! প্রকৃতির বিশালতা আর নির্জন দ্বীপের শূন্যতা অন্যরকম এক অনুভূতিতে জড়িয়ে রাখছিলো আমাদের। রাতভর গান বাজনা হাসি ঠাট্টা করতে করতে কখন যে আসলে ঘুমিয়ে পড়লাম, তা ঠিক খেয়াল নেই।

খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে তাবু থেকে বের হয়েই বিশাল সমুদ্রের অসাধারন সৌন্দ্যর্য চোখে ধাধা লাগিয়ে দিল আমাদের। চরের পাশ দিয়েই হাটতে হাটতে চলে এলাম বাজারে নাস্তা সারতে। স্বন্দীপ সাগর ব্যাষ্টিত হলেও এখানে অনেক দামে মাছ বিক্রি হয়। বিভিন্ন ধরন প্রজাতি এবং আকারের মাছ, শামুক ঝিনুক কিংবা কাঁকড়া সবই দেখতে পেলাম এখানে। শীতকালে যাওয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা পাওয়া গেল যখন সামনে পেলাম খেজুরের রস। এক কথায় অমৃত! শুধু খেজুরের রস আর বাহারী শীতের পিঠা খেতে হলেও শীতে একবার সন্দ্বীপ যাওয়া দরকার। সন্দ্বীপ যেয়ে আরও কিছু খাবার আছে যা না খেয়ে ফেরা বোকামী। যেমন খেজুরের মিঠাই আর সাথে কোরানো নারকেলের খোলাজা পিঠা, কিংবা রসের ফিরনি আর পায়েস। সাইকেল ভাড়া করে পুরো গ্রাম ঘুরার সময় আমরা যেখানে যা টুক টাক স্থানীয় খাবার পেয়েছি, চেষ্টা করেছি সবকিছুরই স্বাদ নিয়ে ফেরার। অন্যান্য জায়গার তুলনায় সন্দ্বীপের যানবাহনের খরচ একটু বেশি বলে মনে হয়েছে। সন্দ্বীপে মোটরসাইকেল নিয়ে কোথাও যেতে হলে ২০০-২৫০টাকা নিবে, সন্দ্বীপে সারা শহর মোটরসাইকেল দিয়ে ঘুরা সবচাইতে উত্তম।সারাদিন ভাড়া ৬০০টাকা, ড্রাইভার নিলে ১০০০টাকা(৩জন),তেল খরচ নিজেদের। বিকেলের মধ্যেই সন্দ্বীপ ছাড়তে হবে বলে টুক টাক ঘুরাঘুরি সেরে আমরা আবারও চলে এলাম সন্দ্বীপ ঘাটে। আরেকবারের মত সুবিশাল এই সৌন্দ্যর্যের হাতছানিতে সাড়া দিয়ে নিজের চোখ জুড়িয়ে নিলাম। আসার পথ ধরেই আবার ফিরে গেলাম কুমিরা ঘাট আর কুমিরা থেকে বাসে উঠে ফিরে এলাম যান্ত্রিক ঢাকায়।

কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটার মত না হলেও এখানের সমুদ্র সৈকতের আছে অন্যরকম সৌন্দ্যর্য। স্থানীয়দের মতে, এই দ্বীপ অনেক বছর আগে জনমানব শূন্য ছিল। সেই থেকে এই দ্বীপের নাম ‘শূন্য দ্বীপ’। দ্বীপের মাটির উর্বরতার কারনে কেউ বা ডাকতো ‘স্বর্ণ দ্বীপ’। আবার এটাও প্রচলিত আছে যে ইউরোপীয় পর্যটকরা বাংলাদেশে আসার সময় দূর থেকে এখানে বালুর স্তুপ দেখে এর নাম দিয়েছিল ‘স্যান্ড দ্বীপ’। ভাষার বিবর্তনে কিংবা সব কিছু মিলিয়েই এখন এই জনপদের নাম ‘সন্দীপ’। সল্পকালীন ভ্রমনের জন্য শীতকালে সন্দ্বীপ ঘুরে আসার মতোই একটি জায়গা। আর ক্যাম্প করলে তো কথাই নেই। ভ্রমন পীপাসুদের প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে এমন কাজ থেকে বিরত থাকার যা দ্বীপের পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে। ভ্রমঙ্কলীন উচ্ছিষ্ট ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন। ভুলে গেলে চলবেনা, যে সচেতনতার শুরু নিজের থেকেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *